ডিএনএ টেস্টের যুগান্তকারী সাফল্য: কেমোথেরাপির ভয়াবহ ধকল থেকে মুক্তি পাবেন লাখ লাখ স্তন ক্যানসার রোগী
লন্ডন — স্তন ক্যানসার চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জিনগত পরীক্ষার মাধ্যমে এখন নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব কোন ক্যানসার রোগীর জন্য কেমোথেরাপি আসলেই প্রয়োজন আর কার জন্য প্রয়োজন নেই।
এই আবিষ্কারের ফলে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ স্তন ক্যানসার আক্রান্ত নারী কেমোথেরাপির মারাত্মক ও কষ্টদায়ক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে অনায়াসেই বেঁচে যাবেন।
এতদিন ধরে স্তন ক্যানসার অস্ত্রোপচারের পর রোগটি যেন পুনরায় ফিরে না আসে, সেজন্য রোগীদের ঢালাওভাবে কেমোথেরাপি দেওয়া হতো।
তবে নতুন এই গবেষণার ফল বলছে, সবচেয়ে সাধারণ ধরনের স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কোনো কেমোথেরাপির সাহায্য ছাড়াই, শুধুমাত্র হরমোন থেরাপির মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।
টিউমার বায়োলজির সাহায্যে জিন পরীক্ষা
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (UCL)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যুক্তরাজ্য, সুইডেন, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং থাইল্যান্ডের ৪০ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ৪,০০০ সদ্য ক্যানসার আক্রান্ত নারী অংশ নেন।
চিকিৎসকেরা রোগীদের শুধুমাত্র টিউমারের আকার বা তা লিম্ফ নোডে ছড়িয়েছে কি না—এমন প্রথাগত লক্ষণের ওপর নির্ভর না করে, টিউমারের জিনগত আচরণ বুঝতে 'প্রোসিগনা' (Prosigna) নামক একটি আধুনিক ডিএনএ টেস্ট ব্যবহার করেন।
কার্যপদ্ধতি: এই পরীক্ষাটি ক্যানসার কোষের বৃদ্ধির জন্য দায়ী ৫০টি সুনির্দিষ্ট জিনের আণবিক কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করে।
ঝুঁকির মাত্রা: পরীক্ষার পর এটি প্রতিটি রোগীর একটি ব্যক্তিগত ‘রিকরেন্স স্কোর’ বা ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকির মাত্রা হিসাব করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশেরই ঝুঁকির মাত্রা ছিল অত্যন্ত কম। ফলে তাদের চিকিৎসায় কোনো কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হয়নি।
দীর্ঘ ৫ বছর ট্র্যাকিং করার পর দেখা যায়, কেমোথেরাপি না নেওয়া এই কম ঝুঁকিপূর্ণ দলের বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৩.৭%। অন্যদিকে, প্রথাগত নিয়মে যারা কেমোথেরাপির পুরো কোর্স সম্পন্ন করেছিলেন, তাদের বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৪.৯%। অর্থাৎ, কেমোথেরাপি না নিলেও রোগীদের বেঁচে থাকার হারে কোনো উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও শারীরিক ধকল থেকে মুক্তি
প্রাথমিক স্তরের স্তন ক্যানসারের মূল চিকিৎসা হলো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমারটি অপসারণ করা। এরপর শরীরে লুকিয়ে থাকা ক্যানসারের আণবিক কণা ধ্বংস করতে কেমোথেরাপি দেওয়া হতো।
তবে ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন যে, সাধারণ স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই বিষাক্ত ওষুধের কার্যকারিতা খুবই সীমিত, অথচ রোগীর শরীরে এটি চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।
কেমোথেরাপির পরিবর্তে নিরাপদ হরমোন বা রেডিয়েশন থেরাপি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় রোগীরা এখন বেশ কিছু জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত থাকবেন:
দীর্ঘস্থায়ী চরম ক্লান্তি ও বমি বমি ভাব
মাথার চুল সম্পূর্ণ পড়ে যাওয়া
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়া
স্থায়ী বন্ধ্যত্ব বা প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হওয়া
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই নতুন জিন পরীক্ষার মডেলটি পুরোপুরি চালু হলে শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (NHS)-এর আওতাতেই প্রতি বছর ৫,০০০-এর বেশি রোগীকে অপ্রয়োজনীয় কেমোথেরাপির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন যুগের সূচনা
আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (ASCO)-এর শিকাগো বার্ষিক সম্মেলনে এই গবেষণার পুরো ডেটা আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে, যা বিশ্বের ক্যানসার গবেষকদের সবচেয়ে বড় সমাবেশ।
প্রধান গবেষকের বক্তব্য: ইউসিএল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের স্তন অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক এবং এই ট্রায়ালের প্রধান তদন্তকারী রবার্ট স্টেইন বলেন, "এই ফলাফল ব্যক্তিগত স্তরের ক্যানসার চিকিৎসায় (Personalized Medicine) একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। প্রথাগত লক্ষণের বদলে টিউমারের বায়োলজিক্যাল আচরণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে অসংখ্য মানুষকে আমরা কেমোথেরাপির শারীরিক ও মানসিক ট্রমা থেকে রক্ষা করতে পারব।"
গবেষকেরা জানিয়েছেন, ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষার ফলাফল শতভাগ প্রমাণিত হলেও, ৪০ বছরের কম বয়সীদের ওপর এই ডিএনএ টেস্ট কতটা কার্যকর তা জানতে আরও কিছু বছর সময় লাগবে। তরুণীদের ওপর এই ট্রায়ালের ফলাফল আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চূড়ান্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
