বোয়িং বিমান থেকে আলাস্কার তেল—চীন কি তবে ইরানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল? মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ট্রাম্পের নতুন ‘মাস্টারপ্ল্যান’ কতটা সফল?

বেইজিং, ১৫ মে ২০২৬ – মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৪০ ঘণ্টার চীন সফর শেষ করে শুক্রবার বেইজিং ত্যাগ করেছেন।


এই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে তাঁর আলোচনা থেকে ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ "ঐকমত্য" প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বেইজিংয়ের সুরক্ষিত ঝংনানহাই কম্পাউন্ডে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, নৌ-অবরোধ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়।

১. ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ‘রেড-লাইন’

এই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান সাফল্য হলো, ট্রাম্প এবং শি জিনপিং উভয়েই একমত হয়েছেন যে, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যাবে না। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরান ৯% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরির খুব কাছাকাছি থাকায় এই আলোচনার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

  • ইউরেনিয়াম মজুদ: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন যে, যেকোনো শান্তিচুক্তির জন্য ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে।

  • চীনের প্রতিশ্রুতি: ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, যুদ্ধ চলাকালীন চীন ইরানকে কোনো সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করবে না বলে প্রেসিডেন্ট শি তাকে আশ্বস্ত করেছেন।

২. হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখার কৌশল

বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে দুই নেতা একমত হয়েছেন। তারা একমত হয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি প্রবাহ সচল রাখতে এই জলপথের নিরাপত্তা অপরিহার্য। সম্প্রতি ইরান এই প্রণালীতে ‘সিলেক্টিভ ম্যানেজমেন্ট’ বা বেছে বেছে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিলেও চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই এই চোকপয়েন্টটি সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

৩. বিশাল বাণিজ্য ও জ্বালানি চুক্তি

মার্কিন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে বেশ কিছু বড় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে:

  • বিমানের অর্ডার: মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে চীন ২০০টি জেট বিমান কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে।

  • কৃষিপণ্য: আগামী তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েকশ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন।

  • আলাস্কা ক্রুড অয়েল: হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকি এড়াতে চীন এখন থেকে আলাস্কা থেকে বিপুল পরিমাণ মার্কিন অপরিশোধিত তেল আমদানিতে সম্মত হয়েছে।

৪. তাইওয়ান নিয়ে চীনের কড়া হুঁশিয়ারি

সহযোগিতার কথা হলেও তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের কঠোর মনোভাব অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সরাসরি সতর্ক করে বলেছেন যে, তাইওয়ানের স্বাধীনতা এবং শান্তি "আগুন ও পানির মতো" যা কখনোই একসাথে সম্ভব নয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের জন্য ১১.১ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড অস্ত্র প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বজায় রয়েছে।

৫. চলমান যুদ্ধ ও মানবিক সংকট

বেইজিংয়ে যখন আলোচনার টেবিলে স্থিতিশীলতার কথা হচ্ছিল, তখন রণক্ষেত্রে প্রাণহানি অব্যাহত ছিল:

  • লেবানন ও গাজা: দক্ষিণ লেবাননে আরও একজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে, যা গত মার্চ থেকে এই সংখ্যাকে ২০-এ নিয়ে গেছে। গাজায় যুদ্ধবিরতির আলোচনার মধ্যেই ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

  • পশ্চিম তীর: দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের সম্পদ ধ্বংস করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সফরকে একটি "বিরাট জয়" হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে বেইজিংয়ের এই মৌখিক প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমাতে কতটা ভূমিকা রাখে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।