মার্কিন-ইরান যুদ্ধ বিবাদ: একদিকে সৌদিতে সেনা মোতায়েন, অন্যদিকে শান্তি আলোচনা মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের দ্বিমুখী নীতি

 
ইসলামাবাদ — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান ১২ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে পাকিস্তান যখন প্রধান কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে এক গোপন দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে এক বিশাল যুদ্ধপ্রস্তুত সামরিক বহর পাঠিয়েছে ইসলামাবাদ।

গোয়েন্দা ও সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এই মোতায়েনের অংশ হিসেবে প্রায় ৮,০০০ সেনা, চীনের সহযোগিতায় তৈরি ১৬টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের একটি পূর্ণাঙ্গ স্কোয়াড্রন, দুটি ড্রোন স্কোয়াড্রন এবং চীন নির্মিত অত্যাধুনিক 'এইচকিউ-৯' (HQ-9) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে।

এই পুরো সামরিক মিশনটির অর্থায়ন করছে রিয়াদ, তবে যুদ্ধাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো সম্পূর্ণভাবে পরিচালনা করছে পাকিস্তানি সামরিক কর্মীরা।
গোপন এই প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় প্রয়োজনে সৌদি আরবে সর্বোচ্চ ৮০,০০০ পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনা এবং যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করার সুযোগ রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও ইসলামাবাদের দ্বিমুখী কৌশল

সৌদি আরবে এই ভারী সামরিক মোতায়েন বিশ্বমঞ্চে ইসলামাবাদের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির এক জটিল ও আপাতবিরোধী অবস্থানকে সামনে এনেছে:

  • শান্তি দূত হিসেবে ভূমিকা: গত মার্চ মাসের শেষভাগ থেকে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে একমাত্র স্বীকৃত গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ব্যাকচ্যানেল হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান। গত এপ্রিলে ইসলামাবাদেই এই যুদ্ধের একমাত্র প্রত্যক্ষ শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে ইরানি প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকে বসেন।

  • সামরিক রক্ষাকবচ: একই সময়ে পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্র এবং ইরানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের সীমান্ত ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সরাসরি সেনা পাঠাচ্ছে।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির চলমান সংকটের শুরু থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন।

ট্রাম্প নিজেই প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, মুনির এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনার পর তিনি ইরানের ওপর পরবর্তী সামরিক হামলা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক নির্ভরযোগ্যতার কারণেই ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল পাকিস্তানের মাটিতে আলোচনায় বসতে রাজি হয়।


কৌশলগত প্রতিরোধ ও পরমাণু ছাতা

সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর এই সেনা মোতায়েনের প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত হয়। ওই হামলায় এক সৌদি নাগরিক নিহত হওয়ার পর রিয়াদও ইরানের ভেতরে বেশ কয়েকটি গোপন পাল্টা হামলা চালায়।

পাকিস্তানের কোর কমান্ডার্স কনফারেন্সে সামরিক নেতৃত্ব ইরানের এই হামলাকে "বিপজ্জনক উস্কানি" এবং "সৌদির সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন" বলে তীব্র নিন্দা জানায় এবং সৌদির নিরাপত্তার প্রতি তাদের অবিচল সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে।

এর আগে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এই গোপন চুক্তির ফলে সৌদি আরব মূলত পাকিস্তানের কৌশলগত পরমাণু প্রতিরোধ ব্যবস্থার (Nuclear Umbrella) সুরক্ষায় চলে এসেছে।


বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপট

২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর আকস্মিক ও ভয়াবহ বিমান হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়, যাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই নিহত হন এবং দেশটির প্রধান সামরিক অবকাঠামোগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।

এর জবাবে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী প্রায় অবরুদ্ধ করে ফেলে, যার ফলে বিশ্বের মোট সামুদ্রিক জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।

বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অর্জিত একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি গত ছয় সপ্তাহ ধরে বলবৎ থাকলেও স্থানীয়ভাবে তা প্রায়ই লঙ্ঘিত হচ্ছে।

ইসলামাবাদ জানিয়েছে, শান্তি চুক্তিটি টিকিয়ে রাখতে তারা দিনরাত ওয়াশিংটন ও তেহরানের সাথে কাজ করে যাচ্ছে।

তবে সৌদি আরবে এই সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েনের বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সৌদি সরকারি মিডিয়া উইং কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।